যাত্রীদের ভরসার প্রতীক কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন এখন নিয়মের চেয়েও বেশি চলছে 'অনিয়মের রাজত্ব'। বিশেষ করে, কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া আন্তঃনগর 'কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস' ট্রেনের নির্ধারিত টিকিট কালোবাজারি চক্রের হাতে জিম্মি, আর এর ফলস্বরূপ এক শ্রেণির অসাধু চক্র 'খাবার বগি সিন্ডিকেট' তৈরি করে বিনা টিকিটে যাত্রী পরিবহন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রেলওয়ে নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অংকের টাকা, যার ফলে রেলওয়ে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ছে।
কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেসের খাবারের বগিতে 'অঘোষিত পরিবহন': টাকার বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা রেলওয়ে নীতিমালা অনুযায়ী, ট্রেনের খাবার বগি (ক্যাটারিং সার্ভিস) শুধুমাত্র স্টাফ এবং খাদ্যদ্রব্য সরবরাহের জন্য নির্ধারিত। এখানে কোনো যাত্রীর প্রবেশ বা অবস্থান সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ।
কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, আন্তঃনগর 'কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস' ট্রেনের নির্ধারিত খাবার বগিতেই প্রায় প্রতিদিনই থাকে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। এই অনিয়ম নাকি চলছে দীর্ঘদিন যাবৎ। অভিযোগের তীর সরাসরি রেলওয়ের দায়িত্বশীলদের দিকে: টিকেট চেকিং স্টাফ (টিটি), খাবার বগির স্টাফ এবং ক্ষেত্রবিশেষে কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত একটি চক্র নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে (জনপ্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত) এই বগিতে বিনা টিকিটের যাত্রীদের উঠতে দিচ্ছে।
নিরাপত্তাহীনতা: বগিতে গাদাগাদি করে যাত্রী ওঠানোর ফলে শুধু আইনই ভাঙছে না, যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা বা অপরাধের ঝুঁকিও বহুলাংশে বেড়ে যাচ্ছে। টিকিট কালোবাজারি: একই সিন্ডিকেটের ভিন্ন রূপ কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেসের খাবার বগির এই অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে টিকিট কালোবাজারির। যখন প্রকৃত যাত্রীরা সঠিক মূল্যে টিকিট পেতে ব্যর্থ হচ্ছেন, তখন তারা বাধ্য হয়েই বেশি টাকা দিয়ে কালোবাজারিদের কাছ থেকে টিকিট কিনছেন, অথবা আরও বেশি টাকা খরচ করে ট্রেনের খাবার বগিতে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা বেছে নিচ্ছেন।
রাজস্ব ক্ষতি: টিকিট বিক্রি থেকে রেলওয়ে যে বিপুল রাজস্ব পেত, তা এখন এই সিন্ডিকেটের পকেটে যাচ্ছে। একটি চক্র একদিকে কৃত্রিম টিকিট সঙ্কট তৈরি করছে, অন্যদিকে তার সুযোগ নিয়ে অন্য একটি অংশ বিনা টিকিটে যাত্রী তুলে রেলের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।
যাত্রী দুর্ভোগ: একদিকে অতিরিক্ত মূল্যে টিকিট কেনা, অন্যদিকে অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ পরিবেশে ভ্রমণ—সবমিলিয়ে সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
কর্তৃপক্ষ নিশ্চুপ: ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি এই গুরুতর অনিয়মের বিরুদ্ধে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এর আগে বিভিন্ন সময়ে টিকেট কালোবাজারি চক্রের সদস্য আটক হলেও, কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেসের অভ্যন্তরীণ এই 'খাবার বগি সিন্ডিকেট' এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অবিলম্বে এই দুটি অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শুধু অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে অপসারণ নয়, বরং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ও রেলওয়ে পুলিশের সমন্বয়ে স্থায়ী নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি করে এই 'অঘোষিত যাত্রী পরিবহন' সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা জরুরি। তা না হলে, কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন তথা পুরো রেলপথে শৃঙ্খলা ফেরানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।